তরমুজ উৎপাদনে প্রসিদ্ধ নোয়াখালী জেলা। একটা সময় দেশের মোট তরমুজের বড় অংশই আসত এখান থেকে। ২০১৮-১৯ মৌসুমে জেলায় ৯ হাজার ৮২১ হেক্টর জমিতে তরমুজের আবাদ হয়েছিল। চলতি মৌসুমে কমে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৩০৪ হেক্টরে। অর্থাৎ গত সাত বছরে আবাদ কমেছে ৬৬ দশমিক ৩৬ শতাংশ, যা মোট আবাদের দুই-তৃতীয়াংশ।
কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, বর্ষায় সুবর্ণচরের সব ইউনিয়ন মেঘনার জোয়ারে ডুবে থাকে। এ সময় জমিতে পলি মাটি পড়ে উর্বরতা অনেক বেড়ে যায়। এজন্য অঞ্চলটিতে তরমুজের ফলন ভালো হয়। হেক্টরপ্রতি জমিতে দ্বিগুণ উৎপাদন হলেও জমি কমে যাওয়ায় আবাদও কমে এসেছে। অথচ চার বছর আগেও দেশে তরমুজ উৎপাদনে শীর্ষ জেলার মধ্যে নোয়াখালীর অবস্থান ছিল চতুর্থ। একই জমিতে বারবার তরমুজ আবাদের কারণে এখন উৎপাদন কমে এসেছে। এক দশক আগেও নোয়াখালীতে ব্যাপক আকারে তরমুজ আবাদ হতো। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া, অসময়ে বৃষ্টিপাত, প্রতিকূল আবহাওয়া, জমির উর্বরতা কমে যাওয়ায় কৃষক আগ্রহ হারাচ্ছেন। সাম্প্রতিক সময়ে জমিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় সার্বিক কৃষি উৎপাদনেও প্রভাব পড়েছে। প্রতি বছর তরমুজ আবাদ বাড়ানো সম্ভব হলে দেশের চহিদার অন্তত ২০ শতাংশ তরমুজ উৎপাদন সম্ভব ছিল নোয়াখালী জেলায়ই।
চট্টগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চট্টগ্রাম কৃষি অঞ্চলের পাঁচ জেলার মধ্যে নোয়খালী তরমুজ চাষের জন্য প্রসিদ্ধ। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, ফেনী ও লক্ষ্মীপুরেও সীমিত পরিসরে তরমুজ আবাদ হচ্ছে। কৃষি অঞ্চলের জেলাগুলোয় গড় উৎপাদন বাড়লেও নোয়াখালীতে উৎপাদন কম-বেশি হচ্ছে।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৮-১৯ মৌসুমে চট্টগ্রাম কৃষি অঞ্চলের শুধু নোয়াখালী জেলায় তরমুজ আবাদ হয় ৯ হাজার ৮২১ হেক্টর জমিতে। হেক্টরপ্রতি উৎপাদন ছিল ২০ টন। মোট উৎপাদন হয় ১ লাখ ৯৬ হাজার ৪২০ টন। চলতি মৌসুমে আবাদ কমে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৩০৪ হেক্টরে। অবশ্য আবাদি জমি কমলেও হেক্টরপ্রতি উৎপাদন বেড়েছে ১৫ টন। এবার প্রতি হেক্টরে উৎপাদন হয়েছে ৩৫ টন। মোট উৎপাদন দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৫ হাজার ৬৪০ টনে। চলতি বছর আবহাওয়া প্রতিকূলে থাকা ও বন্যায় ৫ হাজার ৩২৭ হেক্টর জমিতে আবাদের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও ২ হাজার ২৩ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়নি। গত বছরগুলোর মধ্যে ২০১৯-২০ মৌসুমে ৩ হাজার ২৮৫ হেক্টর জমিতে তরমুজ আবাদ হয়েছে। এছাড়া ২০২০-২১ মৌসুমে ২ হাজার ৪৮৯ হেক্টর, ২০২১-২২ মৌসুমে ৫ হাজার ৮৭৬ হেক্টর, ২০২২-২৩ মৌসুমে ৭ হাজার ৫৯০ হেক্টর ও ২০২৩-২৪ মৌসুমে ৫ হাজার ৩২৭ হেক্টর জমিতে তরমুজ আবাদ হয়।
কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, ২০২১-২২ মৌসুমে দেশের মোট তরমুজ উৎপাদনের ৬ দশমিক ৩ শতাংশ জোগান আসে নোয়াখালী থেকে। এর পরের বছর সেটি দাঁড়ায় প্রায় ১০ শতাংশে। অর্থাৎ নোয়াখালী তরমুজ উৎপাদনে সম্ভবনাময় হলেও প্রতিকূল আবহাওয়া ও কৃষকদের অনাগ্রহের কারণে সেটি কমে গেছে।
এ প্রসঙ্গে নোয়াখালী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মীরা রানী দাস বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নোয়াখালী জেলায় ৮-১০ বছর আগেও ১০ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে তরমুজ আবাদ হতো। উন্নত প্রযুক্তি না থাকা কিংবা উচ্চ ফলনশীল জাতের তরমুজের আবাদ না হলেও সে সময় উৎপাদন ভালোই ছিল। এখন উচ্চ ফলনশীল জাতের তরমুজের আবাদের ফলে কম জমিতে বেশি পরিমাণ তরমুজ উৎপাদন হচ্ছে। তবে সার্বিকভাবে আবাদি জমির পরিমাণ কমেছে।’
তিনি বলেন, ‘তরমুজ যদি একই জমিতে পরপর কয়েক বছর আবাদ করা হয়, তাহলে উৎপাদন ক্রমে কমতে থাকে। সেজন্য দুই বছর তরমুজ আবাদ করার পরের বছর অন্য ফসল আবাদ করতে হয়। পরে আবার তরমুজ আবাদ করলে ভালো ফলন পাওয়া যায়। আমরা কৃষকদের বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করেছি। চলতি মৌসুমে বন্যার কারণে তরমুজ আবাদ কমেছে। তবে নোয়খালীতে তরমুজের যে সম্ভাবনা রয়েছে, সেটির দিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বিশেষ নজর আছে। আগের চেয়ে বেশি জমিতে তরমুজ আবাদ বাড়াতে চেষ্টা করছি। আশা করছি, দ্রুতই সেটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।’
চট্টগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, কৃষি অঞ্চলের পাঁচ জেলা চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, ফেনী, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরে চলতি মৌসুমে তরমুজ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ৭ হাজার ৩৮১ হেক্টর জমিতে। লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আবাদ হয়েছে ৭ হাজার ৮১৪ হেক্টর। ৪৩৩ হেক্টর জমিতে আবাদ বেশি হয়েছে। উৎপাদন হয়েছে ২ লাখ ৬২ হাজার ৮২ টন। ২০২৩-২৪ মৌসুমে ৭ হাজার ৩৮১ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয় ২ লাখ ৪৬ হাজার ৯৭৮ টন, ২০২২-২৩ মৌসুমে ৯ হাজার ৭২৩ হেক্টর জমিতে ৩ লাখ ৪৭ হাজার ৮৬৯ টন, ২০২১-২২ মৌসুমে ৬ হাজার ৮৫৫ হেক্টর জমিতে তরমুজ উৎপাদন হয় ২ লাখ ১৭ হাজার ৬৪১ টন।
চট্টগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মোহা. নাছির উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘তরমুজ উৎপাদন এ অঞ্চলের মধ্যে নোয়াখালীতেই বেশি হয়। চলতি মৌসুমে লক্ষ্মীপুরে আবাদ ও উৎপাদন হঠাৎ বেড়েছে। নোয়াখালীর তরমুজের চাহিদা দেশজুড়ে। এখন আবাদ কিছুটা কমেছে। উৎপাদন বাড়াতে উচ্চ ফলনশীল জাতের তরমুজ আবাদ বাড়ানোর বিষয়ে মাঠ পর্যায়ে কাজ চলছে।’